• ঢাকা
  • সোমবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২১ আগস্ট, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ২১ আগস্ট, ২০২৫

পাটগুদামের জমি নিয়ে ষড়যন্ত্র: ষাট বছরের পুরনো সম্পত্তি দখলবাজির কাহিনি! 

অনলাইন ডেস্ক

পাটগুদামের জমি নিয়ে ষড়যন্ত্র: ষাট বছরের পুরনো সম্পত্তি দখলবাজির কাহিনি! 

 

ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক পাটগুদাম সংক্রান্ত জমি নিয়ে সাম্প্রতিককালে নতুন করে জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। সরকারি রেকর্ড, দলিলপত্র ও আদালতের মামলা-মোকদ্দমা ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, ষাট বছরের পুরনো একটি ‘এক্সিকিউশন কনভেয়েন্স ডিড’ এর মাধ্যমে বহু আগে আদমজী জুট মিলসের নামে হস্তান্তরিত জমিকে নতুন করে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে মামলা ও রেজিস্ট্রি সম্পাদনের খেলায় নেমেছে।

 

জমির প্রাথমিক ইতিহাস :

 

সিএস রেকর্ড অনুযায়ী জমির প্লট নং-২৬৭৪, খতিয়ান নং-১৫৫৭ এর মালিক ছিলেন রেবতী মোহন দাস, পিতা- গৌরচন্দ্র দাস, বসবাস করতেন ঢাকা টাউনে।

এসএ জরিপে (খতিয়ান নং-২১০৯) জমিটি ১০৬৫৮, ১০৬৫৯, ১০৬৬০ দাগে মোট ৫৫.২৪ একর হিসাবে লিপিবদ্ধ হয়, যার মধ্যে বাড়ি ও হালট হিসেবে উল্লেখ ছিল।

 

১৯৬৩ সালে এক্সিকিউশন কনভেয়েন্স ডিড এর মাধ্যমে জমিটি হস্তান্তরিত হয় আদমজী জুট মিলস লি. বরাবর। রেজিস্ট্রি দলিল নম্বর-১০৭, তারিখ ১৮-০৯-১৯৬৩, যা করাচি জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষিত আছে। দলিল মোতাবেক ১৯৬৪ সালে জমির নামজারি হয় এবং পরবর্তীতে খারিজা খতিয়ান প্রস্তুত হয়।

 

জুটমিলের দখল ও মামলা :

 

আদমজী জুট মিলস এই জমির মালিকানা গ্রহণ করে এবং খাজনাও নিয়মিত পরিশোধ করে।

১৯৬৯ সালে জমির কিছু অংশ ভাড়াটিয়া বঙ্কিম চন্দ্র দে সরকার অবৈধভাবে দখল করতে চাইলে, জুটমিল কর্তৃপক্ষ মোকদ্দমা নং-৫৩/১৯৬৯ দায়ের করে এবং মামলায় জয়লাভ করে। বঙ্কিমচন্দ্র পরে ভাড়া পরিশোধ করতে শুরু করেন।

 

রেকর্ডে আরও উল্লেখ আছে, রেবতী মোহন দাস দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান এবং তাঁর কোনো সম্পত্তি বাংলাদেশে অবশিষ্ট ছিল না। ১৯৬৭ সালে প্রশাসনের নোটিশেও এটি উল্লেখ করা হয়।

 

পরিত্যক্ত সম্পত্তির রূপান্তর:

 

জুট কর্পোরেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পাটগুদামটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে।

পরে বিআরএস জরিপে জেলা প্রশাসকের নামে ১/১ খতিয়ানে জমিটি লিপিবদ্ধ হয়। অর্থাৎ, জমিটি সরকারি মালিকানায় চলে যায়।

 

রবীন্দ্র মোহন দাসের হঠাৎ উত্থান :

 

ষাট বছর পর, ২০২২ সালে, রেবতী মোহন দাসের ছেলে দাবি করে পরিচিত রবীন্দ্র মোহন দাস জেলা প্রশাসক ও বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা নং-৫১৪/২২ দায়ের করেন।

তিনি দাবি করেন জমিটি তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি। কিন্তু তদন্তে ও মামলার শুনানিতে দেখা যায়-

 

জমি ১৯৬৩ সালেই বিক্রি হয়ে গেছে।

 

রেবতী মোহন দাস ১৯৮৮ সালে মারা যান। তিনি জীবিত অবস্থায় কখনও কোনো আপত্তি বা মামলা করেননি।

 

দীর্ঘ ষাট বছর পর তাঁর ছেলে রবীন্দ্র হঠাৎ জমি দাবি করেন, যা আইনগতভাবে অযৌক্তিক ও সন্দেহজনক।

 

২০২৫ সালের ৮ মে মামলাটি আদালত খারিজ করে দেন।

 

রহস্যজনক দলিল ও রেজিস্ট্রির ঘটনা

 

তবে এখানেই শেষ নয়। তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে-

 

১৭-৯-২০২৪ তারিখে রবীন্দ্র মোহন দাস আমমোক্তারনামা করে মিরাশ উদ্দিন সুমনকে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেন।

 

মিরাশ উদ্দিন পরে মামলাটিকে নতুন করে চালু করেন (ছানি মামলা)। মামলার প্রাথমিক শুনানির তারিখ ২৮-৮-২০২৫ নির্ধারিত হয়।

 

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মামলাটি চলমান অবস্থায় ১৬-৩-২০২৫ তারিখে জমিটি আবার রেজিস্ট্রি করে বিক্রি করা হয়!

 

দাতা হিসাবে উল্লেখ করা হয় রবীন্দ্র মোহন দাস ওরফে মনমোহন দাসকে, আর তাঁর পক্ষে স্বাক্ষর করেন সিনিয়র সহকারী জজ পবন চন্দ্র বর্মণ।

 

মাত্র ৫ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ৮৪ শতক জমি বিক্রি দেখানো হয়, যদিও জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য কয়েকশো কোটি টাকা।

 

জালিয়াতি ও অনিয়মের চিহ্ন:

 

তদন্তে উঠে এসেছে একাধিক অসঙ্গতি-

 

1. জমি ১৯৬৩ সালে বৈধভাবে বিক্রি হয়ে গেছে এবং নামজারি সম্পন্ন হয়েছে।

 

2. রেবতী মোহন দাসের মৃত্যুর ৩৫ বছর পর তাঁর ছেলে রবীন্দ্র জমি দাবি করেন, যা সময়োপযোগী নয়।

 

3. আদালতে মামলা চলমান অবস্থায় জমি বিক্রির ঘটনা স্পষ্টত বেআইনি।

 

4. সরকারি সম্পত্তি ‘পরিত্যক্ত ভূমি’ হিসাবে রেকর্ডভুক্ত হওয়ার পরও দলিল সম্পাদন করা বড় ধরনের জালিয়াতি।

 

5. আদালতের কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে রেজিস্ট্রি সম্পাদন করায় দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট।

 

অনুসন্ধানী মন্তব্য

 

সব তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে বলা যায়, পাটগুদামের জমি নিয়ে একটি চক্র ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সরকারি সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে চাইছে।

 

প্রথম ধাপ: পুরনো উত্তরাধিকারী পরিচয়ে জমির দাবি।

 

দ্বিতীয় ধাপ: মামলার মাধ্যমে মালিকানা বৈধ করার চেষ্টা।

 

তৃতীয় ধাপ: মামলাটি চলমান থাকা অবস্থায় জাল দলিলের মাধ্যমে জমি বিক্রি।

 

এখানে স্পষ্টত ভূমি রেকর্ড জালিয়াতি, আদালতের প্রক্রিয়াগত অপব্যবহার এবং রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতি কাজ করেছে।

 

ময়মনসিংহের এই ঐতিহাসিক পাটগুদাম জমি ষাট বছরের বেশি সময় আগে আদমজী জুট মিলসের নামে হস্তান্তরিত হয়েছিল। পরে এটি সরকারি সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ড হয়। অথচ একদল দালাল ও ভূমিদস্যু এখন আইনি ফাঁকফোকর ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে এই সম্পত্তি দখল করতে চাইছে।

 

এটি কেবল একটি জমি দখলের মামলা নয় -এটি সরকারি সম্পত্তি লুটপাটের বড় ধরনের ষড়যন্ত্র।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে রেজিস্ট্রি বাতিল, ভূমিদস্যুদের শনাক্তকরণ ও শাস্তির ব্যবস্থা করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন জালিয়াতির সাহস না পায়।

 

লেখক-

মজিবুর রহমান শেখ মিন্টু

সম্পাদক ও প্রকাশক

অনিন্দবাংলা

আরও পড়ুন