
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ শাজাহান চেয়ারম্যানের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ
পিয়াস আহমদ: নেত্রবাংলাঃ
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এস. এম বজলুল কাদের শাহজাহান চেয়ারম্যানের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) নেত্রকোনায় বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে তাঁর নিজ বাড়ির মসজিদ ও এতিমখানাসহ জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
মরহুম এস. এম বজলুল কাদের শাহজাহান চেয়ারম্যান ১৯৪২ সালে নেত্রকোনা সদর উপজেলার লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের বাইশধার গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এক স্ত্রী, দুই ছেলে, ছয় মেয়ে, নাতি-নাতনী, ভাতিজা-ভাতিজি, আত্মীয়স্বজনসহ অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ও হাজারো গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
তিনি ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত স্নেহভাজন ও আদর্শের একজন নিবেদিত সৈনিক। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের প্রত্যক্ষ শ্রোতা এই নেতা মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি নেত্রকোনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সফল সভাপতি, প্রথমবারের উপজেলা চেয়ারম্যান, রেড ক্রিসেন্ট নেত্রকোনা ইউনিটের একাধিকবার ভাইস চেয়ারম্যান এবং তিনবার লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আমজনতার কাছে তিনি ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ ও গ্রহণযোগ্য জনপ্রতিনিধি।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, মৃদুভাষী ও অতিথিপরায়ণ। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান, অসুস্থ মানুষের খোঁজখবর নেওয়া এবং মৃত ব্যক্তির জানাজায় অংশগ্রহণ ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকার নবাবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। কর্মজীবনের শুরুতে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ও জ্ঞানী মানুষ। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, সভাপতি ও উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
শাজাহান চেয়ারম্যানের সততা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে তাঁর নামে বরাদ্দকৃত সরকারি টিএ-ডিএ বাবদ ২৪ হাজার ৫০০ টাকা ব্যবহার না করে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেন। সে সময় নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না থাকায়, নিজের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি জিপগাড়ি ব্যবহার করে শত শত অসহায় রোগীকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন এবং নিয়মিত তাদের খোঁজখবর নিতেন।
তিনি দীর্ঘদিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। দুর্নীতি তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনসহ প্রতিটি জাতীয় আন্দোলন ও নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর বহুবার সাক্ষাৎ, কোলাকুলি ও এক টেবিলে বসে আলোচনার সৌভাগ্য হয়। বঙ্গবন্ধু তাঁকে স্নেহভরে ‘শাজাহান’ বলে ডাকতেন। নেত্রকোনার মোক্তারপাড়ায় মসজিদ কোয়ার্টারে তাঁর বাসায় বঙ্গবন্ধুর আগমন ও রাত্রিযাপনের স্মৃতি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সমাজ ও রাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।
নেত্রকোনা জেলার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ কাকাসহ জেলার বহু প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আজও বলেন, শাজাহান চেয়ারম্যানের মতো মানুষ নেত্রকোনার মাটিতে আর জন্ম নেবেন না, তাঁর কোনো বিকল্প নেই।
উল্লেখ্য, শাজাহান চেয়ারম্যান ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। পরদিন ২৭ জানুয়ারি বাদ যোহর নেত্রকোনার মদনপুরে শাহ্ সুলতান উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি নেত্রকোনার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
পরিবারের পক্ষে তাঁর সন্তান এস. এম মাঈনুল কাদের ও এস. এম শফিকুল কাদের সুজা মরহুম পিতা এস. এম বজলুল কাদের শাহজাহান চেয়ারম্যানসহ পরিবারের সকল সদস্যের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।
আপনার মতামত লিখুন :