
অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের এনআইডি দেওয়ার অভিযোগে নেত্রকোনায় তোলপাড়

নেত্রবাংলা অনলাইন ডেস্ক:
নেত্রকোনায় অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) করে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসের একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়ম বহির্ভূতভাবে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। এর মাধ্যমে তারা পাচ্ছে বাংলাদেশি নাগরিকত্বের পরিচয়, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
অনুসন্ধানে পাওয়া একটি এনআইডিকে কেন্দ্র করে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য। জান্নাত বেগম নামে এক নারীর নামে তৈরি জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ৩৩৩১০৮৯৫৮৫। পরিচয়পত্রে পিতা হিসেবে মো. আব্দুল হাসিম, মাতা হিসেবে মোসাঃ আনজু এবং ঠিকানা হিসেবে নেত্রকোনা সদর উপজেলার পুকুরিয়া গ্রামের নাম উল্লেখ করা হয়। তবে এসব তথ্য যাচাই করতে গিয়ে একের পর এক অসংগতি সামনে আসে।
পিতা-মাতার এনআইডি যাচাই করে দেখা যায়, মো. আব্দুল হাসিম ও মোসাঃ আনজু প্রকৃতপক্ষে স্বামী-স্ত্রী ছিলেন এবং তারা নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার বিরামপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। প্রায় এক দশক আগে আব্দুল হাসিম মারা যান। তাদের সংসারে চার ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। একমাত্র মেয়ের নাম স্নিগ্ধা আক্তার হাসি। জান্নাত বেগম নামে তাদের কোনো কন্যাসন্তান নেই।
পরিবারের সদস্য মোতাহার হোসেন বলেন,
“আমার জান্নাত বেগম নামে কোনো বোন নেই। আমার একমাত্র বোন স্নিগ্ধা আক্তার হাসি। তার আট বছর আগে ধর্মপাশা সদরে বিয়ে হয়েছে এবং সে সেখানে ভোটার।”
একই কথা জানান বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা মঞ্জিল মিয়াও। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্যেও বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ৩নং বড়কাশিয়া-বিরামপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আলী নূর বলেন,
“আব্দুল হাসিম ও মোসাঃ আনজুর সংসারে জান্নাত বেগম নামে কোনো মেয়ে নেই। কেউ যদি তাদের পরিচয় ব্যবহার করে ভোটার হয়ে থাকে, তাহলে সেটা নিঃসন্দেহে জালিয়াতি।”
অনুসন্ধানে ভোটার ডাটা এন্ট্রির প্রুফ কপিতে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরেও অসংগতি ধরা পড়ে। নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেলেও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগে জানা যায়, সেটির ব্যবহারকারী আরফান শাকিল নামের এক ব্যক্তি। তিনি ময়মনসিংহের আকুয়া এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে চীনে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জান্নাত বেগম নামে তার কোনো পরিচিত নেই।
জন্মনিবন্ধন যাচাইয়ে উঠে আসে আরও ভয়াবহ তথ্য। জান্নাত বেগমের নামে নির্বাচন অফিসে সংরক্ষিত জন্মনিবন্ধনের কপি নিয়ে নেত্রকোনা পৌরসভায় যোগাযোগ করা হলে কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই জন্মনিবন্ধন তাদের সার্ভারে নেই। এটি অন্য একটি জন্মনিবন্ধন স্ক্যান করে ডিজিটালভাবে সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে ভোটার তালিকাভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ফরম-২ পর্যালোচনায়। সেখানে শনাক্তকারী, সুপারভাইজার ও যাচাইকারীর এনআইডি নম্বর উল্লেখ থাকলেও সার্ভারে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটিই সাজানো হয়েছে ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন অফিসের একাধিক কর্মচারী জানান,
“জান্নাত বেগম একজন রোহিঙ্গা। দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে ভোটার করা হয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সিহাব উদ্দিন এই এনআইডি করে দিয়েছেন। শুধু তিনি নন, এই চক্রের সঙ্গে জেলার একজন অফিসারও জড়িত। এভাবে ১.৫ থেকে ২ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি এনআইডি করা হয়েছে।”
ভোটার ফরম-২-এ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সিহাব উদ্দিনের স্বাক্ষর এবং ২১ মার্চ ২০২৫ তারিখের উল্লেখও পাওয়া গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. সিহাব উদ্দিন বলেন,
“ভোটার হালনাগাদের সময় জান্নাত বেগম ভোটার হয়েছেন। এতগুলো এনআইডি আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। এখানে কোনো লেনদেন হয়নি। তদন্তে বহিরাগত প্রমাণ মিললে বাতিলের জন্য চিঠি দেওয়া হবে।”
জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন জানান,
“বিষয়টি তদন্ত করা হবে। যদি তিনি রোহিঙ্গা হয়ে থাকেন এবং কেউ সহযোগিতা করে থাকে, তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন,
“তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উল্লেখ্য, এর আগেও নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের ভুয়া কাগজপত্র তৈরির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ ডিসেম্বর মোহনগঞ্জ উপজেলায় ইউএনওর আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ১৩ রোহিঙ্গার জন্মনিবন্ধন তৈরির ঘটনায় শাওন নামের এক কম্পিউটার দোকানদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এছাড়া কলমাকান্দা উপজেলার রামনাথপুর পাগলা এলাকায় এক রোহিঙ্গা অর্থের বিনিময়ে ভুয়া পরিচয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
আপনার মতামত লিখুন :